ইউজার আর কাস্টমার একই, নাকি ভিন্ন? যদি ভিন্ন হয়, তাহলে অভিজ্ঞতাও কি ভিন্ন?

একটি প্রোডাক্ট ডিজাইন করার সময় আপনি কাকে ফোকাস করবেন — যে এটি কিনছে, নাকি যে এটি ব্যবহার করছে? আমরা প্রায়ই “User” ও “Customer” শব্দ দুটো একে অপরের পরিবর্তে ব্যবহার করি, কিন্তু জানেন কি?
এই দুটোর মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে, যা ডিজাইন ও বিজনেস ডিসিশনের ক্ষেত্রে অনেক বড় প্রভাব ফেলে কারণ ইউজার ও কাস্টমারের চাহিদা, ব্যবহারপ্রক্রিয়া, এমনকি অভিজ্ঞতাও কিন্তু এক নাও হতে পারে!
চলুন, ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করি।
ইউজার বনাম কাস্টমার: পার্থক্য কোথায়?
ইউজার (User)
ইউজার হল সেই ব্যক্তি, যে কোনো ডিজিটাল প্রোডাক্ট বা সার্ভিস ব্যবহার করে। তারা সরাসরি প্রোডাক্টের সাথে ইন্টারঅ্যাক্ট করে এবং তাদের অভিজ্ঞতা নির্ভর করে প্রোডাক্টের ডিজাইন, ফাংশনালিটি, এবং ইউজার ইন্টারফেসের উপর।
তাদের মূল লক্ষ্য হলো কোনো নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করা বা প্রয়োজন মেটানো।
কাস্টমার (Customer)
কাস্টমার হল সেই ব্যক্তি বা সংস্থা, যারা কোনো প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের জন্য টাকা দেয় বা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়।
উদাহরণস্বরূপঃ ধরুন আমি ৬ বছর ধরে Adobe Illustrator সফটওয়্যারটি ব্যবহার করি, কিন্তু গত ২ বছর ধরে Adobe এর Paid Subscription নিয়ে লাইসেন্স সহ চালাই, যখন ফ্রী ব্যবহার করতাম তখন আমি ছিলাম Adobe এর একজন ইউজার কিন্তু এখন আমি যেহেতু তাদের Adobe Illustrator এর Paid ভার্সন ব্যবহার করি সুতরাং এখন আমি তাদের কাস্টমার হবো।
তাহলে হয়তো বলা যেতে পারে,
“ সকল কাস্টমারই ইউজার , কিন্তু সকল ইউজারই কাস্টমার নয় "
বলা হয়তো যেতে পারে কিন্তু এটা কি সর্বদাই সঠিক? — না, বিষয়টা এমন না!
কারণ সকল কাস্টমার ইউজার নাও হতে পারে!
ধরুণ, আপনার কাছে একটা রিকোয়ারমেন্ট আসলো যে আপনাকে একটি Baby Feeder (বাচ্চাদের ফিডার) এর ডিজাইন করতে হবে...
তো এখানে এই ফিডার কিনবেন বা ফিডারের কাস্টমার হলো বাচ্চার বাবা-মা, কিংবা পরিবারের অন্য কেউ... তাহলে এখানে তারা কি এই প্রোডাক্টের ইউজার হবেন?
উত্তর, অবশ্যই না। এক্ষেত্রে বাবা মা কিংবা পরিবারের অন্য কেউ শুধুমাত্রই কাস্টমার, ইউজার নাহ!
এখানে আরও একটি বিষয় শেখার আছে,
একটা প্রোডাক্ট এর ডিজাইন করার সময় সবসময় যে ইউজার এরই রিসার্চ করবেন বিষয়টা এমন না অনেক ক্ষেত্রে কাস্টমার এরও ইন্টারভিউ/মতামত নেয়া লাগতে পারে, যেমন ধরুন এই ফিডার ডিজাইন করার সময় কিন্তু,
Empathaise phase এ আপনি ইন্টারভিউ নিতেন বাচ্চার বাবা মা'র সঙ্গে, বাচ্চার সঙ্গে না, যে এই ফিডার এর ইউজার কারণ কারণ বাচ্চারা তাদের প্রয়োজন ও চাহিদা নিজে প্রকাশ করতে পারে না। তাই বাবা-মা বা অভিভাবকের কাছ থেকেই বোঝা যাবে, একটি বেবি ফিডারের ডিজাইনে কী কী জিনিস প্রয়োজনীয়, কোন সমস্যা তারা ফেস করছে, এবং তারা কী ধরনের ফিডার কিনতে আগ্রহী।
এবার আসি, ইউজার ও কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে,
UX (ইউজার এক্সপেরিয়েন্স): ইউজার যখন কোনো ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ বা সফটওয়্যার ব্যবহার করে, তখন তার ইন্টারঅ্যাকশন ও অভিজ্ঞতাকে UX বলা হয়। একটি ভালো UX ডিজাইন নিশ্চিত করে যে ইউজার সহজেই তার প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে পারে, কোনো জটিলতা ছাড়াই।
CX (কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স): CX হলো একজন কাস্টমার ব্র্যান্ড বা অর্গানাইজেশনের সাথে সম্পূর্ণ যাত্রার অভিজ্ঞতা — প্রথমবার জানার মুহূর্ত থেকে, পণ্য/সেবা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, কাস্টমার সাপোর্ট, এবং পরবর্তী ইন্টারঅ্যাকশন পর্যন্ত। এটি ব্র্যান্ডের প্রতি কাস্টমারের সামগ্রিক অনুভূতি তৈরি করে।
আসুন, আমরা একটা গল্পের মাধ্যমে UX ও CX বোঝার চেষ্টা করি...
ধরুন আলভি তার বন্ধু সাব্বিরের বিয়ের দাওয়াত পেয়েছে, এখন সে চায় বিয়ের অনুষ্ঠানে একদম চমৎকার একটা নতুন পাঞ্জাবি পরতে। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে সে শপিং মলে যাওয়ার সময় পাচ্ছে না, তাই সে একটা অনলাইন স্টোর “A-Style” থেকে পাঞ্জাবি কেনার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তাদের ফেইসবুক পেইজ থেকে ওয়েবসাইটের এড্রেস নিয়ে ভিজিট করে,
তো ওয়েবসাইটে ঢুকে ফার্স্ট গ্লান্সেই তার ওয়েবসাইট টি বেশ ভালো লাগে, দ্রুত লোডিং নিচ্ছে সব, আকর্ষণীয় ডিজাইন, আর সহজ নেভিগেশন দেখে আলভির মুগ্ধ হয়। পাঞ্জাবির কালেকশন গুলিও বেশ সুন্দর ক্যাটাগরি অনুযায়ী সাজানো তাই সহজেই সে তার পছন্দের ও প্রয়োজনীয় ডিজাইন খুঁজে পায়।
প্রোডাক্ট পেইজে আবার হাই-রেজোলিউশন এর কয়েকটা ছবি, সাইজ চার্ট এর স্পষ্ট গাইড এবং ইউজার রিভিউ ছিল, যা আলভিকে ডিসিশন নিতে আরও হেল্প করে!
চেকআউট প্রোসেসও ঝামেলামুক্ত, কয়েক টা ক্লিকেই অর্ডার প্লেস করা গেছে আবার মুহূর্তের মধ্যে কনফার্মেশন মেইলও চলে আসছে যে "সর্বোচ্চ ৩ দিনের মধ্যেই ডেলিভারি চলে আসবে তার দেয়া লোকেশনে"
সব মিলিয়ে আলভির এই দারুণ অভিজ্ঞতা কে আমরা বলবো, ভালো ইউজার এক্সপেরিয়েন্স (UX).
পরবর্তীতে,
তিন দিন পার হয়ে গেছে কিন্তু ডেলিভারি আর আসে না.. তিন দিন তো দূরের কথা, এক সপ্তাহ পার হলেও কোনো আপডেট নেই! অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে আলভি কাস্টমার কেয়ারে ফোন দেয় — কেউ ধরে না, ম্যাসেজেও কোনো রিপ্লাই আসে না। ওদিকে সাব্বিরের বিয়ে আর মাত্র ৪ দিন পর, অবশেষে ১০ দিন পর পার্সেল এলো, বিয়ের ১ দিন আগে।
কিন্তু অর্ডার আসার পর দেখা গেলো, আলভি যে রঙের পাঞ্জাবি অর্ডার করেছিল, সেটার পরিবর্তে এসেছে অন্য রঙের! তার উপরে সাইজও ভুল, তার শরীরে একদম ফিট হচ্ছে না! রিটার্ন বা রিফান্ডের সহজ কোনো উপায় নেই, কাস্টমার কেয়ার অভিযোগ শুনেও দায় নিতে নারাজ —বলে ‘স্টকের সমস্যা’ ছিল, কিছু করার নেই।’
এই পুরো পরিস্থিতি আলভিকে অনেক হতাশ করে তুললো!
এবারে আলভির যেই অভিজ্ঞতা টা হয়েছে সেটার কারণে সে পুরো ব্রান্ড কেই দোষারোপ করছে এবং ডিসিশন নিয়েছে একটা নেগেটিভ রিভিউ দিয়ে তার এই খারাপ অভিজ্ঞতার কথা জানাবে। সে এটাও ডিসিশন নিয়েছে যে আর কখনো সে এই ব্রান্ড থেকে আর কেনাকাটা করবে না ও রাগ নিয়ে তার আশেপাশের মানুষ দেরও তার বাজে অভিজ্ঞতার কথা বলেছে।
এখানে আলভির এই অভিজ্ঞতা কে আমরা বলবো একটা বাজে কাস্টমারের এক্সপেরিয়েন্স (CX), যার ফলে ব্র্যান্ডটি শুধু একজন লয়াল কাস্টমারই হারায় নাই, বরং আরও সম্ভাব্য কিছু কাস্টমারদেরও হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে!!